আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকরের কারণে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের অনেক সময় দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে তারা জামিনে বা আইনি প্রক্রিয়ায় বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উদ্যোগে আয়োজিত ‘আমার শহর, আমার দেশ—পরিচ্ছন্নতায় বদলে যায় বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পরে তারা আবার বের হয়ে একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আইজিপি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় এক হাজার মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মাদক আমাদের নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক আকর্ষণীয় নাম দিয়ে তরুণদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে সন্তানদের সচেতন করার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে আলী হোসেন ফকির বলেন, একজন সন্তান মাদকে আসক্ত হলে শুধু তার নিজের জীবনই নষ্ট হয় না, পুরো পরিবারকেই এর মূল্য দিতে হয়। দায়িত্ব পালনের সময় এমন ঘটনাও দেখেছেন, যেখানে মাদকের টাকা না দেওয়ায় সন্তান নিজের বাবাকেই মারধর করে আহত করেছে।
আইজিপি বলেন, পুলিশের কার্যক্রম আরও জনবান্ধব ও জনগণমুখী করতে হবে। তবে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু লোক দেখানো কর্মসূচি নয়, বাস্তব পরিবর্তন আনতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর পরিবেশ দূষণ কমাতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে গাছ লাগাতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন আইজিপি। তিনি বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই রাস্তা পারাপার ও সড়ক ব্যবহারের নিয়ম শেখানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু গাছ লাগানো নয়, রাজধানীবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরির একটি বৃহৎ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নগরবাসী যদি নিজেদের শহরকে নিজের ঘরের মতো ভালোবাসে এবং যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে, তাহলে ঢাকার চেহারা বদলানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘ঢাকাকে বদলাতে হলে আগে আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে।’ প্রত্যেক নাগরিক অন্তত একটি গাছ লাগানোর পাশাপাশি নগর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে সারা বিশ্বেই পরিবেশ বিরূপ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে গাছ লাগানো ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠান শেষে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে একটি নিমগাছ রোপণ করেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। এ সময় কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আইনি সংস্কার ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, হাজার হাজার মাদক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।